প্লাস্টিকের বদলে কাগজের কাপ
কেপিসি ইন্ডাস্ট্রিজের কারখানায় কাগজ দিয়ে পরিবেশবান্ধব কাপ তৈরির কাজ তদারক করছেন প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী কাজী সাজেদুর রহমান। সম্প্রতি রাজধানীর তেজগাঁওয়ে। ছবি: সাজিদ হোসেন
- ২০১২ সালে যাত্রা শুরু হয় কাজী সাজেদুর রহমানের কেপিসি ইন্ডাস্ট্রিজের।
- দেশে চাহিদা বাড়ছে।
- বর্তমানে মাসে ১ কোটি ২০ লাখ কাপ বিক্রি হয়।
- পূর্বাচলে গড়ে তুলছেন নতুন কারখানা।
দেশে ফিরেই শেয়ারবাজার থেকে নিজের সব টাকা তুলে নিলেন।
পেপার কাপের ব্যবসা বুঝতে গেলেন মালয়েশিয়া। চেষ্টা-তদবির করে একটি কারখানায়
উৎপাদনপ্রক্রিয়াও দেখে নিলেন। তারপর যন্ত্রপাতির খোঁজে ছুটলেন চীনে।
কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে যন্ত্রপাতি দেখার পাশাপাশি ১৫ দিনের প্রশিক্ষণও নিলেন।
দেশে ফিরে ব্যাংকঋণের আবেদন করলেন। প্রথমবার ব্যর্থ। তবে দ্বিতীয়বারের
চেষ্টায় সফল হলেন। ঋণপত্র খুলে আমদানি করলেন যন্ত্রপাতি। তেজগাঁওয়ে ভাড়া
করা ছোট কারখানায় যাত্রা শুরু করল কেপিসি ইন্ডাস্ট্রিজ। আর পেছনের মানুষটি
হচ্ছেন তরুণ উদ্যোক্তা কাজী সাজেদুর রহমান।
২০১২ সালের মে মাসে কেপিসির উৎপাদন শুরু হয়। বর্তমানে
কেপিসির কারখানায় দিনে ৩ লাখ ৬০ হাজার পিস পেপার কাপ তৈরি হয়। কয়েকটি
ব্র্যান্ড এসব কাপ চা-কফি, কোমল পানীয়, দই ও আইসক্রিম বিক্রিতে ব্যবহার
করে। অনেক করপোরেট প্রতিষ্ঠান নিজেদের কর্মী ও গ্রাহকদের চা-কফি ও পানি
পরিবেশনের জন্য পেপার কাপ তৈরি করিয়ে নেয়।
কেপিসির করপোরেট গ্রাহকের তালিকায় আছে পেপসি, প্রাণ,
এসিআই, ইউনিলিভার, নেসলে, ইস্পাহানি, ইগলু, ডানো, বসুন্ধরা, শেভরন,
অ্যাপোলো হাসপাতাল, সোনারগাঁও হোটেল, বেক্সিমকোর মতো ২৮০টি প্রতিষ্ঠান।
খোলা বাজারেও পেপার কাপ বিক্রি করে তারা। সব মিলিয়ে মাসে ১ কোটি ২০ লাখ কাপ
বিক্রি হয়। তবে ৯০ শতাংশই ব্র্যান্ড ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানে যায়।
শুরু থেকেই ভালো সাড়া পাচ্ছে কেপিসি। প্রতিষ্ঠানটির
স্বত্বাধিকারী কাজী সাজেদুর রহমান বলেন, ‘উৎপাদন শুরুর পরের মাসে পেপার কাপ
নিয়ে আমরা আমেরিকান প্রতিষ্ঠান শেভরনের কার্যালয়ে গেলাম। আধা ঘণ্টা
আলোচনার পর তারা প্রতি মাসে দুই লাখ পিস কাপের ক্রয়াদেশ দিয়ে দিল। প্রতি
পিসের দাম ছিল ২ টাকা ২০ পয়সা। নিজেদের কর্মীদের পানি পানের জন্য এসব কাপের
ক্রয়াদেশ দেয় শেভরন। সেদিনই আমরা পেপার কাপ নিয়ে গুলশান কাঁচাবাজারে
গেলাম। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে ৩ হাজার কাপ বিক্রিও করে ফেললাম।’
কেপিসি বর্তমানে ১১ ধরনের কাগজের কাপের পাশাপাশি প্লেট বা
থালা ও বাটি তৈরি করছে। আকার ও নকশাভেদে প্রতিটি কাপ ৮০ পয়সা থেকে ৮ টাকা
দামে বিক্রি হয়। তা ছাড়া ২ থেকে ৪ টাকায় প্লেট এবং ৩ থেকে ৪ টাকায় বাটি
বানিয়ে দেয় প্রতিষ্ঠানটি।
পরিসংখ্যানও সাজেদুরের পক্ষেই কথা বলছে। গত ২০১৬-১৭
অর্থবছরে ১১ কোটি টাকার পেপার কাপ বিক্রি করে কেপিসি ইন্ডাস্ট্রিজ। তার
আগের অর্থবছর তাদের বিক্রির পরিমাণ ছিল ৭ কোটি টাকা। তার মানে গত অর্থবছরই
কেপিসির প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫৭ শতাংশ।
গত ৩১ জানুয়ারি তেজগাঁওয়ে কেপিসির কারখানায় গিয়ে দেখা যায়,
ছোট্ট কারখানায় পেপার কাপ উৎপাদনে ব্যস্ত শ্রমিকেরা। চীন থেকে আমদানি করা
কাগজের ওপর প্রথমে নকশা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লোগো (প্রয়োজন অনুযায়ী)
ছাপানো হয়। তারপর নির্দিষ্ট কাপের আকার অনুযায়ী যন্ত্রে কাটা হয়। সেই কাগজ
যন্ত্রের মাধ্যমে তাপ দিয়ে কাপের আকার দেওয়া হয়। কাগজের দুই অংশ জোড়া দিতে
কোনো ধরনের আঠা বা অন্য কোনো উপাদান ব্যবহার করা হয় না।
শ্রমিক-কর্মচারী-কর্মকর্তা মিলে কিপিসিতে ৩৮ জন লোক কাজ করেন।
এদিকে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কারখানা সম্প্রসারণের উদ্যোগ
নিয়েছেন কাজী সাজেদুর রহমান। পূর্বাচলে শীতলক্ষ্যা নদীর পাশে ২৪ শতাংশ
জায়গার ওপর ১৫ কোটি টাকা বিনিয়োগে নতুন কারখানার নির্মাণকাজ চলছে। সেখানে
কয়েক মাসের মধ্যেই উৎপাদন শুরু হবে। পুরোনো কারখানার সাতটি যন্ত্র সেখানে
যাবে। নতুন করে আসছে আরও সাতটি। বর্তমান কারখানায় দিনে ৩ লাখ ৬০ হাজার পিস
কাপ উৎপাদন হয়। নতুন কারখানায় উৎপাদনক্ষমতা বেড়ে হবে দৈনিক ৮ থেকে ১০ লাখ
পিস।
কেপিসি ছাড়া আরও ছয়টি কারখানা পেপার কাপ উৎপাদন করে। পেপার
কাপের মূল কাঁচামাল কাগজ। সেই কাগজ আমদানিতে ৬১ শতাংশ শুল্ক ও কর দিতে হয়।
অন্যদিকে পেপার কাপ উৎপাদনে প্রচুর কাগজ অপচয় হয়। যাঁরা অপচয় বন্ধ করতে
পারেন না, তাঁদের কারখানা বন্ধ করা ছাড়া উপায় নেই। সে জন্যই সাতটির মধ্যে
চারটি উৎপাদনে নেই বলে জানালেন কাজী সাজেদুর রহমান।
পূর্বাচলের কারখানায় উৎপাদন শুরু হলে পেপার কাপ রপ্তানি
শুরু করবে কেপিসি। ইতিমধ্যে বাহরাইন, নিউজিল্যান্ড, সুইডেন, অস্ট্রেলিয়া ও
নেদারল্যান্ডসের ক্রেতাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। এমন তথ্য দিয়ে কাজী
সাজেদুর রহমান বললেন, ‘সারা বিশ্বে পেপার কাপের ২৮ হাজার কোটি ডলারের বাজার
আছে। যার বড় অংশই চীন, তুরস্ক ও ভারতের উদ্যোক্তাদের দখলে। ফলে ভালো সুযোগ
আছে। সেটাই আমরা কাজে লাগাতে চাই। সেই পরিকল্পনা নিয়েই আমরা এগোচ্ছি।’
অবশ্য রপ্তানির চেয়ে দেশের বাজার নিয়ে বড় স্বপ্ন তরুণ এই
উদ্যোক্তার। তিনি স্বপ্ন দেখেন দেশের মানুষ প্লাস্টিকের কাপের বদলে দেশের
কারখানায় উৎপাদিত পরিবেশবান্ধব কাগজের কাপে চা খাবেন। তবে তাঁর স্বপ্নের
পথে বাধা ভারতের কাপ। এসব কাপ কাঁচামালের (কাগজ) মতো একই শুল্ক দিয়ে আমদানি
হচ্ছে। তাতে দেশের উদ্যোক্তারা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না। এ বিষয়ে নজর
দিতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রতি অনুরোধ জানালেন কেপিসির
স্বত্বাধিকারী। একই সঙ্গে কাগজ আমদানির শুল্ক কমানোর দাবি তাঁর। কারণ
হিসেবে তিনি বললেন, ভারতের উদ্যোক্তারা শূন্য শুল্কে পেপার কাপের কাগজ
আমদানি করতে পারেন। নেপালে সাড়ে ৭ শতাংশ ও মধ্যপ্রাচ্যে ৫ শতাংশ শুল্কে
কাগজ আমদানি করা যায়। আর বাংলাদেশে ৬১ শতাংশ শুল্ক।
২০১৬ সালে এসএমই ফাউন্ডেশনের বর্ষসেরা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার
পুরস্কার পান কাজী সাজেদুর রহমান। পুরস্কার নেওয়ার সময় তিনি বলেছিলেন, ‘আমি
তখনই সফল হব যখন আরও মানুষের কর্মসংস্থান করতে পারব।’ আর গত সপ্তাহে
বললেন, ‘চলতি বছর কেপিসির জনবল বেড়ে ১০০ ছাড়িয়ে যাবে। তবে আমি আরও বড়
স্বপ্ন দেখছি।’